আইবিএফবির গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ মোকাবেলায় দরকষাকষি ও শুল্কনীতি সংস্কারের পরামর্শ

যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ মোকাবেলায় বাণিজ্যিক দরকষাকষি ও শুল্কনীতি সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ মোকাবেলায় বাণিজ্যিক দরকষাকষি ও শুল্কনীতি সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের বৃহত্তম দুটি অর্থনীতি। তারা যে ধরনের বাণিজ্যিক নীতি প্রণয়ন করে, সেভাবেই বিশ্বের অর্থনীতি চলে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর বাণিজ্য শুল্ক বাড়িয়েছে, যা বাংলাদেশকে মোকাবেলা করতে হবে কৌশলগত আলোচনা ও বাণিজ্যের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টেকসই বাণিজ্য কাঠামো গড়ে তুলতে হলে নীতিগত সংস্কার, বহুমুখী রফতানি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাস, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের প্রস্তুতি এবং কৌশলগত আলোচনারও প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া একটি শুল্কনীতি প্রণয়ন করতে হবে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হবে।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) আয়োজনে গতকাল ‘‌যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য পুনর্গঠন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক ও ব্যবসায়ীরা।

বৈঠকে আইবিএফবির সভাপতি লুতফুন নিসা সৌদীয়া খানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (অর্থ মন্ত্রণালয়) ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ আরোপের পর বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সেখানে আমাদের কৌশলগতভাবে এগোতে হবে। শক্তিশালী লবিং গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু আমরা যে তাদের সঙ্গে চুক্তি করব সেখানে আমাদের জন্য কথা বলার কোনো লবিং নেই, আমরা যোগ্য কাউকে পাচ্ছি না। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা সহযোগিতা করতে পারে।’

বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আস্থার একটি ঘাটতি রয়েছে জানিয়ে ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘তারা আমাদের সন্দেহের চোখে দেখে, এটা কাটিয়ে উঠতে হবে। এজন্য একটি বিশেষায়িত বাণিজ্য আলোচনা সংস্থা গড়ে তোলা হবে। দেশে কাউকে না পেলে বিদেশ থেকেও কনসালট্যান্ট নিয়োগ করা যায়। এছাড়া আমরা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছি বিশেষ নেগোশিয়েট ট্রেড তৈরি করার।’

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। তিনি বলেন, ‘‌বিশ্ব বাণিজ্যের বৃহত্তম রফতানিকারক চীন এবং আমদানিকারক যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ট্যারিফ আরোপ করায় বিশ্ব বাণিজ্যে একটি প্রভাব পড়বে। কারণ বর্তমানে চীনের পণ্যে গড় শুল্ক ৫৪ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১০ শতাংশ। এ ট্যারিফ ব্যবধান বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতার জন্য হুমকি। তাই আমাদের রফতানিবান্ধব শুল্ক কাঠামো তৈরি করতে হবে।’

পিআরআই চেয়ারম্যান বলেন, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু অন্যান্য খাতে ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। যদি এসব পণ্যকে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিতে চায়, তাহলে বাণিজ্যিক দরকষাকষি করতে হবে।’

ট্যারিফ কমিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এফটিএ বা পিটিএ করতে পারলে রফতানি বাণিজ্য সহজ হবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘‌ট্যারিফের ক্ষেত্রে আমাদের পণ্যের ওপর গড় ট্যারিফ কত হচ্ছে সেটি দেখতে হবে। কারণ ট্যারিফ কমালে গড় ট্যারিফও কমবে। সেজন্য বাণিজ্যে দরকষাকষি নীতি লাগবে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে এফটিএ করা যেতে পারে, এর মাধ্যমে দরকষাকষি হবে। এজন্য আমাদের আলোচনা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।’

ট্যারিফ কমানোর ক্ষেত্রে নন-ট্যারিফ পণ্যের উপযুক্ততা বৃদ্ধি এবং আমদানীকৃত পণ্যের খালাস কার্যক্রম সহজ করার পরামর্শ দিয়েছেন আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘‌এখানে পণ্যের উপযুক্ততা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি কাস্টমসের ভ্যাট হ্রাস ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে হবে। কাস্টমসকে আধুনিকায়ন করতে হবে। পণ্য খালাসের সময় কমিয়ে আনতে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।’

বাণিজ্য বৃদ্ধি ও পণ্যের ওপর ট্যারিফ কমিয়ে আনতে গবেষণা ও উন্নয়নের দিকে সরকারকে নজর দেয়ার আহ্বানও জানান অ্যামচেম সভাপতি।

বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এএমবি হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইএসএস) পরিচালক (গবেষণা) ড. মাহফুজ কবির ও আইভিএফবির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি মাহামুদুল ইসলাম চৌধুরী প্রমূখ।

আরও